শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে ৩৯ কোটি ২০ লক্ষ ডলারের লজিস্টিকস হাব তৈরির যৌথ প্রকল্প থেকে সরে গেল চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংস। ২০২৩ সালে এই বিনিয়োগকে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের পর দেশটিতে আসা ‘প্রথম বড় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে প্রকল্পটি বাতিলের কারণ হিসেবে সংস্থাটি বাহ্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং বাণিজ্যিক বিবেচনার কথা জানিয়েছে।

২০২৩ সালে কলম্বো বন্দরে প্রস্তাবিত ‘সাউথ এশিয়া কমার্শিয়াল অ্যান্ড লজিস্টিকস হাব’ বা এসএসিএলএইচ প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল চায়না মার্চেন্টস গ্রুপ। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শ্রীলঙ্কায় সংস্থাটির মোট বিনিয়োগ ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছনোর কথা ছিল। চুক্তি অনুযায়ী, যৌথ উদ্যোগে চায়না মার্চেন্টসের ৭০ শতাংশ অংশীদারি থাকার কথা ছিল। শ্রীলঙ্কা বন্দর কর্তৃপক্ষ (এসএলপিএ) এবং দেশটির একটি বেসরকারি নির্মাণসংস্থার হাতে থাকার কথা ছিল ১৫ শতাংশ করে অংশীদারি।

কিন্তু সোমবার, ১৯ অক্টোবর, শ্রীলঙ্কা বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, “বর্তমান বাহ্যিক পরিস্থিতি, বাণিজ্যিক বিবেচনা এবং সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ মূল্যায়নের পর প্রস্তাবিত যৌথ উদ্যোগটি নিয়ে আর এগিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” বিকল্প হিসেবে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি বা পিপিপি মডেলে একটি নতুন লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ।

২০২৩ সালে এই বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় শ্রীলঙ্কার জন্য প্রকল্পটিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। ২০২২ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বিদেশি ঋণ পরিশোধে খেলাপি হওয়ার পর দেশটির অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল প্রবল।

শ্রীলঙ্কায় আগে চুক্তিবদ্ধ হওয়া কোনও প্রকল্প থেকে বড় বিনিয়োগকারীর সরে যাওয়ার ঘটনা এই নিয়ে দ্বিতীয় বার। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর শ্রীলঙ্কার ৪৪ কোটি ২০ লক্ষ ডলারের একটি বিতর্কিত পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকল্প থেকে সরে গিয়েছিল আদানি গ্রিন। ২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসা অনুরা কুমারা দিশানায়েকে সরকার ওই প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম নিয়ে নতুন করে আলোচনা করতে চাওয়ার পর সংস্থাটি সরে দাঁড়ায়।

কেন বাতিল চিনা প্রকল্প?

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া একটি নথিতে চায়না মার্চেন্টস জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবেশ ও সময়সূচিতে পরিবর্তন-সহ বিভিন্ন বাহ্যিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বাণিজ্যিক বিবেচনা খতিয়ে দেখে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংস্থার মতে, প্রকল্প বাতিল করাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সর্বোত্তম স্বার্থের অনুকূল হবে। তবে বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনও কারণকে একক ভাবে দায়ী করা হয়নি।

কৌশলগত গুরুত্ব কলম্বো বন্দরের

গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য পথের কাছে অবস্থিত কলম্বো বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র। কৌশলগত গুরুত্বের কারণে বন্দরটি চিন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলির কাছেও তাৎপর্যপূর্ণ।

কলম্বো ইন্টারন্যাশনাল কন্টেনার টার্মিনালে (সিআইসিটি) চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংসের ৮৫ শতাংশ অংশীদারি রয়েছে। অন্যদিকে, পাশের কলম্বো ওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনালে (সিডব্লিউআইটি) আদানি ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট হোল্ডিংসের হাতে রয়েছে ৫১ শতাংশ অংশীদারি। এ ছাড়াও শ্রীলঙ্কার দক্ষিণে হাম্বানটোটা বন্দর পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত চিনা সংস্থাটি।

কলম্বো বন্দরের নতুন লজিস্টিকস হাব প্রকল্প থেকে চায়না মার্চেন্টসের সরে দাঁড়ানোয় শ্রীলঙ্কার পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠল। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত হচ্ছে না; বরং বিকল্প অংশীদারি মডেলে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।